-দে টাকা দে..?
-কিসের টাকা?
-কিসের টাকা বুঝস না..?
-না।আমার ক্লাসে লেট হচ্ছে আমি গেলাম।
-ওই লম্বু ওই যাবি মানে রিকশার ভাড়া দিবে কে তোর বাপ।
-দেখ মুটকি বাপ তুলবি না কিন্তু....
-হাজার বার তুলব কি করবি তুই?
-তোর নাক ফাটিয়ে দেব।
-বাহ চমৎকার।তো ভেজা ভেড়াল থেকে কবে বাঘ হলি
রে চান্দু।
-দেখ মায়া ভার্সিটি ক্যাম্পাসে এসে ঝগড়া করিস না পাব্লিকে
দেখছে।
-তোর পাব্লিকরে টুট মারি ভাড়া দিবি কিনা বল।
-দেখ মায়া আমি কিন্তু তোর সিনিয়র বড় ভাই সম্মান দিয়ে কথা
বলিস।
-তাই না সিনিয়র দেখাচ্ছি তোকে...(একটা চোরা হাসি দিল)
-অতঃপর তাহাই ঘটিল যাহা বহুকাল হইতে চলিয়া আসিতেছে।মুটকি
ওর হাতির মত পা দিয়ে আমার পায়ের উপর কিক মারিল।ব্যাথায়
কেকিয়ে উঠতে গিয়েও চাপা আর্তনাদে শান্ত হয়ে
গেলাম।
-পকেট থেকে টাকা বের করে দিলাম।
-মুটকি সারামুখে যুদ্ধজয়ের হাসি মাখিয়ে চোখ টিপ্পুনি মারল।
-হাসবি না শয়তানি গা জ্বলে আমার।
-হাসব বেশি করে হা হা হা হো হো হো।
-কি হচ্ছে কি মায়া সবাই দেখছে। আমার মান ইজ্জত কিছু রাখলি
না।
-দরকার নাই তোর মান ইজ্জতের তোর পাশে আমি আছি
এটাই তোর গর্ব।
-ভুল বললি ওটা গর্ব না আমার দুর্ভাগ্য এবং সেটা ভয়ানক।
-কি কি বললি তুই?(চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে)
-ক্লাসে লেট হচ্ছে আমি যাই।
-যাবি মানে এই শোন..
-হুম বল।
-বলছি শোন না।(আমার শার্টের বোতাম ধরে টানাটানি
করছে)
-উফফ বলবি তো না কি।
-এত রেগে যাচ্ছিস কেন একটু রোমান্টিক হতে পারিস না।
-দেখ মায়া আমার ক্লাস অলরেডি শুরু হয়ে গেছে এখন না
গেলে মিস করে যাব।
-একটা ক্লাস মিস করলে কিছু হবেনা।
-তুই বলবি না আমি যাব।
-এই বলছি তো শোন না..
-হুম বল।
-আমার চোখের দিকে তাকা একটু।
-আমার কিন্তু রাগ হচ্ছে এবার মায়া।
-আচ্ছা যা আর বলব না।
-ওকে গেলাম।
-এই শোন না...
-আবার কি...?
-বলছি বললি না তো আমার কানের দুলটা কেমন হয়েছে..?
-তোর কানে আবার দুল হা হা হা কই দেখছি না তো।
-এইতো এই যে দেখ।
-হা হা হা হা
-হাসলি কেন ভাল হয় নি...?
-এত ছোট দুল তোর হাতির মত কানে হে হে হে....
-শয়তান আমার হাতির মত কান? দেখিস তোর বউয়ের
গন্ডারের মত কান হবে না না তোর বউয়ের পেত্নির মত
এত্ত বড় কান হবে।
-আচ্ছা হবে।এখন যাই।
-এই শোন না?
-আবার কি হল...?
-ক্লাস শেষে চল না একটু ঘুরে আসি..
-পাগল নাকি আমার কাজ আছে।
-তোর আবার কিসের কাজ আন্টি তো বলে তুই নাকি সারাদিন
শুয়ে থাকিস।
-হ্যা আমি সারাদিন শুয়ে থাকি আর ভার্সিটিতে তোর বাপ
আসে।
-ঐ ফইন্নি মুখ সামলে কথা বলবি উনি তোর মুরব্বী।
-ও তাই তাহলে যখন আমার আব্বুকে তুলিস তখন মনে
থাকেনা।
-আমার তো মাথা গরম হয়ে যায়।
-আমারও হয়।
-না হবে না।
-হবে।
-হবে না।
-এই যা ক্লাসের আধাঘন্টা পার হয়ে গেছে তোর জন্য
শুধু মুটকি।
-হু একদম গায়ে দোষ দিবিনা।নিজেই তো আমার সাথে
বকবক করছিস।
-তুই একটা...
-আমি একটা কি?
-আজব পেইন।
-কি বললি আবার বল...
-কিছুনা।
-না বল...
-কিছু না তো।
-আমি পেইন না...
-আ হু উ হু হু হু হু
-হি হি হি আশেপাশে কেউ নেই রে তোর কপাল ভাল
কোন মেয়ে নেই।
-আমি কিন্তু প্রতিশোধ নিব মায়া।
-যা যা।
-হু।(ঘাড় ঘুরিয়ে হাঁটা দিলাম)
-ঠিক একঘন্টা পর যেন তোকে এখানে পাই।(চেচিয়ে
বলল)
-পারবনা আসতে।
-তোর বাপ আসবে চৌদ্দ গুষ্ঠী আসবে।
-ইচ্ছে করছে দৌড়ে গিয়ে মুটকির নাকটা ফাটিয়ে দেই।
কিন্তু অদৃশ্য এক বেড়াজালে আমি বিদ্ধ।
.
পৃথিবীর বুকে জীবন্ত ডাইনী যদি কেউ দেখতে চায়
এই মুটকী মায়াকে দেখতে পারে সে।লম্বা নখ
ভ্যাম্পায়ের মত দাঁত আর স্বভাবটা জল্লাদদের থেকেও
বেশি খারাপ।তবে চেহারাটা মিষ্টি চেয়ে বেশি কিছু।যদি
কেউ ত্রিশ সেকেন্ড তার চোখের দিকে তাকিয়ে
থাকে নিশ্চিত সে প্রেমে হাবুডুবু খাবে।এই ডাইনীটা
রাক্ষসীর মত একটু মুটকি।আমি বেশ টের পাই ওকে যখন
প্রথম প্রথম মুটকী বলে ক্ষেপিয়ে তুলতাম রাগে
নিজের মাথার চুল ছিড়ত কেঁদে ফেলত।সেখান থেকেই
চেষ্টা করে যাচ্ছে না খেয়ে বিভিন্ন উপায়ে স্বাভাবিক
হওয়ার জন্য।যদিও আমি জানি ওকে মুটকি বললে এখন আর
সামনা সামনি রাগ করেনা কিন্তু লুকিয়ে কাঁদে।
.
যাই হোক ওই ডাইনীর চোখের জল দেখে যে
আবেগে গলে যাবে সে করবে মস্ত ভুল।যেমনটা
আমি করেছি।ওকে বেশি কথা বললেই চোখের পানি
নাকের মিশে একাকার।কিছুই বলতে পারিনা কারন ওকে কাঁদতে
দেখলে আমার এতটা খারাপ লাগে কেন জানিনা।এই দুর্বলতার
সুযোটাই ও ব্যাবহার করে।আমার ঘাড়ে ওঠার সেই করুন
কাহিনী একটু বর্ণনা করি...
খুব বেশি একটা ছোট ছিলাম না তখন।ক্লাস ফোরে পড়তাম।
ভাল মন্দ বোঝার বয়স হয়েছে একটু একটু।একদিন আব্বু
এসে বলল আমরা কাল শাহরিয়ার আঙ্কেলের বাসায় যাব
বেড়াতে।শাহরিয়ার আঙ্কেল আব্বুর ব্যাবসার নতুন পার্টনার
শুনেছিলাম আম্মুর কাছে তবে কোনদিন যাইনি কারন
আঙ্কেলরা একটু দূরে থাকত তবে এখন নাকি আমাদের
পাশের বাসায় এসে উঠেছে।তো যাই হোক এটা নিয়ে
আমার কোন মাথাব্যাথা ছিলনা যদিও কিন্তু আম্মু আমাকে বলল
সেখানে নাকি আমার এক নতুন বন্ধু হবে।সারাদিন ঘরে
বন্দী থাকা এক কিশোরের কানে যদি কেউ বলে তার
একটা বন্ধু হবে তাহলে তার মনে যে কতটা খুশি জমে
বলতে পারব না।প্রচন্ড খুশি মনে গেলাম আঙ্কেলের
বাসায়।আন্টি আমার গাল টিপে দিয়েছিল এখনও মনে আছে।
তো সারা বাসায় দেখি মাইকেল জ্যাকসনের পোশাক পরিহিতা
একজন দৌড়ে বেড়াচ্ছে।বুঝতেই পারছিনা ছেলে না
মেয়ে।চুলগুলো যদিও একটু লম্বা তবে হাব ভাব দেখে
মনে হচ্ছে ছেলে।যাই হোক সেদিকে আমার কোন
খেয়াল নেই আমি খুঁজছিলাম আমার মত আমার বন্ধুটিকে।কারন
আমার বন্ধু তো আমার সমবয়সী হবে।যেটা সারাঘরে
দৌড়ে বেড়াচ্ছে সে আমার থেকে অনেক ছোট
পিচ্চি।ঘুরতে ঘুরতে একটা রুমে এসে আমি একটা নীল ঘুড়ি
দেখে হাতে তুলে নেই।সত্যি বলতে ওটা আমার ভীষন
পছন্দ হয়েছিল।মনে মনে ভেবেছিলাম আমার অচেনা
বন্ধুটির হয়ত।
কিন্তু আমার সব ভাবনায় ছেদ পড়ল।হাতে প্রচন্ড ব্যাথা অনুভব
করলাম।মনে হচ্ছিল কেউ সুচ ঢুকিয়ে দিয়েছে।হাতের
দিকে তাকাতেই দেখি মাইকেল জ্যাকসনের কপি টা আমার
হাত কামড়ে ধরে আছে।একটানে ছাড়িয়ে ব্যাথায় ককিয়ে
উঠে বললাম কে তুমি..?
-আমি কে তা জেনে তোর লাভ কি...?
-এই তুমি তুই তুই করে বলছ কেন?
-হে হে হে হে কেন তুই কি আমার থেকে অনেক
বড় যে তোকে তুমি করে বলতে হবে।
-হ্যা বড় তুমি করে বল।
-বলব না কি করবি?
-আম্মুকে বলে দেব।
-হে হে হে ভীতুর ।
-মোটেও না।
-তাহলে চোর...
-এই আমাকে চোর বলবে না।
-একশতবার বলব তুই চোর চোর চোর চোর
-চুপ আমি কি চুরি করেছি?
-আমার ঘুড়ি চুরি করেছিস।
-মোটেও না আমি শুধু দেখছিলাম।
-ও তাই....
আস্তে আস্তে আমার কাছে এসে মাথায় মাথা ঠেকিয়ে
কিছুক্ষন বাঘিনীর মত তাকিয়ে থেকে বলল...
-বন্ধু হবি না শত্রু...
-মা মা মা মানে...?(আমতা আমতা করে বললাম)
-কোনটা হবি?
-তুমি অনেক ছোট তুমি আমার বন্ধু হতে পারবেনা।
-ও তাই তাহলে আমার শত্রু হবি হা হা হা।
-মোটেও না আমরা কিছু হবনা।
-কিছু তো একটা হতে হবে। তাছাড়া তোর গালটা অনেক
সুন্দর তোকে আমার ভাল লেগেছে আয় আমরা বন্ধু হই।
-কখনই না।
-কি বললি?
-হবনা।
-তোর বাপ হবে।(বলেই হাতে কামড় বসাল)
কি জানি কি হল আমার ব্যাথায় চিৎকার করতেও ভুলে গেলাম।ওর
চোখের দিকে তাকিয়ে অজান্তেই কখন হ্যা বলে
ফেলেছিলাম।আর এই রাজি হওয়াটাই আমার জীবনের
অভিশাপের মত নেমেছে।
সময়ের সাথে সাথে বেড়ে উঠেছি যদিও এখন এই
অবস্থানে এসেও ওকে বোঝাতে পারলাম না আমরা বন্ধু
হতে পারিনা।আমি থার্ড ইয়ারে আর সে ফার্ষ্ট ইয়ারে।বাসা
হোক,ক্যাম্পাস হোক,কিংবা বাইরে কোথাও তুই করে সে
বলবেই।এত করে বলি মায়া বড় হয়েছিস একটু বোঝ তবু
মুটকি পাত্তাই দেয়না।আমাকে সেই যে জ্বালিয়ে আসছে
এখনও জ্বালায়।নিজের মনের মত করে জ্বালাবে বলে
পাব্লিক ভার্সিটি ছেড়ে প্রাইভেট ভার্সিটিতে এসেছে
যেটায় আমি পড়ি।সময়ের সাথে সব বদলালেও ওর মাস্তানী
স্বভাব যায়নি।এখন অবশ্য মানুষের সামনে হাতে কামড় দিতে
পারেনা তাই অস্ত্র হিসেবে ওর পা দিয়ে আমার পায়ের
উপর এত্ত জোরে আঘাত হানবে নাইবা বললাম সে যন্ত্রনার
কথা।না পারি ব্যাথায় শব্দ করতে না পারি পাল্টা জবাব দিতে।বেশি
কিছু আবার বলতে গেলে আমারই বেশি ক্ষতি।কয়েকদিন
আগে ওর সাথে সিনেমা দেখতে যাইনি।মায়ের কাছে
নালিশ গেছে আমি নাকি কোনদিনও ক্লাস করিনা সারাদিন সিনেমা
হলে পড়ে থাকি।মা ও তেমন গপ গপ করে গিলে
ফেলে সাজানো গোছানো মিথ্যে গুলো।আর
গিলবেই বা না কেন আমার মিষ্টির ডিব্বা বোন আছে না।মায়ার
সাথে গলায় গলায় ভাব।নাইবা বললাম দুঃখের কথা।কিছু কিছু
মানুষের জীবন এমনই সীমাবাধা নিয়মে চলে।
এতকিছু সহ্য করার পরেও যখন স্বাভাবিক ভাবেই নিচেকে
গুছিয়ে তুলেছি।তখনই শুরু হয়েছে নতুন মাত্রার প্যারা।আমি
জানি মায়া একটু একটু করে স্বপ্ন বুনতে শুরু করেছে।
সেদিন বাসায় মাকেও বলতে শুনেছি মায়াকে পুত্রবধু
করবে।আমি এসব নিয়ে ভাবতেই পারিনা।একটা প্রেম পর্যন্ত
করতে পারিনি।একবার তো একটা মেয়েকে রাজি করিয়েই
ফেলেছিলাম।কিন্তু কোথা থেকে মুটকি এসে বলে
সে নাকি আমার বিয়ে করা বউ।তারপর আর কি?যা হবার তাই হল।
সুন্দরী ললনার পাঁচ আঙুলের দাগ বসল গালে।একে তো
প্রেমে ব্যার্থ হয়ে দুঃখে আছি তার উপর মুটকি টা কানের
কাছে লাউড মিউজিক বাজাচ্ছে।দিলাম একটা থাপ্পড়। কেমন
লাগে বুঝে দেখ।হা হা হা সেবার রাগ করে একমাস কথা
বলেনি আমার সাথে।কিন্তু আশ্চর্য্য হয়েছিলাম ও বাসায় কিছু
বলেনি।যাই হোক এভাবেই সে প্যারায় ডুবিয়ে রাখে
আমাকে।এতকিছুর পর ওর নিষ্পাপ মুখটা আমাকে পথভ্রষ্ট
করে...।
.
একঘন্টা পনের মিনিট পর....
হাঁপাতে হাঁপাতে আসলাম গেইটের বাইরে....।
-বুনো ষাঁড়ের মত কোথা থেকে ছুটে আসলি।
-ক্যান্টিন থেকে।
-কয়টা বাজে এখন।
-কত বাজে জানিনা তবে পনের মিনিট লেইট হয়েছে।
-বাহ সময় জ্ঞান আছে দেখি।
-চল।
-যাব তো এদিকে আয়।
-না রে ভাই পায়ে ভীষন ব্যাথা।
-তো দাঁত কেলিয়ে যখন বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে
দিতে ভুলে যাস কেউ একজন ওয়েট করছে তোর
জন্য তখন মনে থাকেনা?
-স্যরি তো।
-তোর স্যরির গুল্লি মারি।
-আচ্ছা তোকে তিনটে আইসক্রিম দিব।
-ও হ্যালো আমি বাচ্চা না যে এসব কথায় গলে যাব।
-তো পাকা বুড়ি বলেন আপনার লাগবে।
-উমমমম ভাবতে দে।
-ভাব ফইন্নি।
-কিছু বললি?
-কই না তো।
-আমাকে নিয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত লেকের পাশে বসতে
হবে।
-ইম্পসিবল।
-ও তাই না আয় এদিকে।।
-এই না এটা কিন্তু অন্যায়....
-তাহলে বল যাবি?
-নাহ...
-দাড়া ওখানে...
-এই না না মায়া....
ছো মেরে রিকশায় তুলল আমাকে।তাকিয়ে আছি ওর
দিকে।চাপা শয়তানি হাসি হাঁসছে মনে মনে....
.
সন্ধ্যার ক্ষনিক আগে....
-এই নে বাদাম এবার উঠ ফিরতে রাত হয়ে যাবে।
-হোক সমস্যা নাই।
-তোর নাই কিন্তু আমার আছে।
-তোর লজ্জা করেনা আমি মেয়ে হয়ে বলছি আমার
সমস্যা নেই আর তুই ছেলে হয়ে সমস্যার কথা বলছিস।
-বাসায় গেলে আজকে আম্মু কি করবে তুই জানিস না।
-আমি বলে দেব আন্টিকে। এখন বাদাম খা তো।
-তুই খা মুটকি।আর শোন...
-কি?
-পরের বার থেকে না তোর বি এফ কে নিয়ে আসিস।
-হা হা হা হা
-হাসলি যে...
-কিছুনা এমনি।
-চল উঠি।
-উমমমম হাতটা ধর আমার...
-পারবনা।
-কি বললি?
-ধরছি।
-হুম।
-এভাবে জাপটে ধরলে হাঁটব কি করে।(আমার হাতের
ভিতরে একহাত দিয়ে মাথাটা কাঁধে রেখে হাঁটছে)
-জানিনা আমার শীত করছে।
-সে তো করবে।বার বার বলেছিলাম আসতে হবেনা।
-উফফ তুই থামবি। চুপ করে হাঁট তো।
.
বাসায় পৌছে দিয়ে আমার বাসায় আসলাম।আশ্চর্য কেউ
কোন কৈফিয়ত চাইলনা।শুধু মা একবার জিজ্ঞাসা করল দুপুরে কিছু
খেয়েছি কিনা।অবশ্য আমি জানি মায়ার সাথে সারা দিন রাত
থাকলে কেউ কিছু বলবেনা।এতে তো উনাদেরই লাভ।
খেয়ে দেয়ে নিজের রুমে এসে শুয়ে পড়েছি।
-উহুম উহুম(মিষ্টি বোনের প্রবেশ)
-কি যেন শুনছি রে ভাইয়া।
-কি শুনছ তুমি..?
-নাহ তেমন কিছু না আবার অনেক কিছু...।
-তো কি সেটা বলে ফেল আর কার থেকে শুনছ নাম
বল।
-কতকিছুই তো শুনছি। আকাশে বাতাসে ভেসে আসছে
আমার কানে।
-সোজাসুজি বলবি তুই?
-না মানে আজকে সারাদিন কোথায় ছিলি রে তুই?
-তোর জন্য জামাই দেখতে গেছিলাম।
-ওহ ভাল। তো জামাই কি আজকাল লেকের পাশে ভাবীর
পাশে বসে দেখতে হয় ভাইয়া।
-ফালতু কথা কে বলে তোকে?
-সব কি আর বলা লাগে আমাদের ও তো চোখ আছে
নাকি।
-চোখ দিয়ে ভাল কিছু দেখা যায় না।
-ভাইয়া ভাবী প্রেম করছে এর থেকে ভাল দৃশ্য আর কি
হতে পারে।
-তুই যাবি না আমি আম্মুকে ডাকব।
-বিয়েটা তাড়াতাড়ি সেরে ফেল রে।
-আম্মু তোমার মেয়েকে ডাক দাও তো।
আমি বুঝিনা এই শাঁকচুন্নীর কানে খবরটা কে দেয়।নিশ্চয়ই
ওই মুটকি দিয়েছে।
.
পরেরদিন.....
ক্যাম্পাস থেকে একপ্রকার কিডন্যাপ করেই ধরে
এনেছে আমাকে।দীর্ঘ তিন ঘন্টা যাবৎ শপিং মলে ঘুরছি।
একটা নূপুরের জন্য এত সময় কেউ ব্যায় করে।
-এই শুভ্র এই...
-হুম বল।
-দেখ না এইটা কেমন আমাকে মানাবে তো?(নীল পাথর
বসানো সুন্দর একজোড়া নূপুর দেখিয়ে বলল)
-ওইটা তোর পায়ে দিলে হাতির পায়ে শিকল দেওয়ার মত
লাগবে।
-ধুর আর কিনবই না।
-কেন?
-তুই সবসময় এমন করিস।
-যাহ আমি তো সত্যিটাই বলেছি।
-চোখ কটমট করে কিছুক্ষন তাকাল তারপর বেরিয়ে আসল।
রিক্সায় উঠে বসেছি....
-আমি কি দেখতে সত্যিই খুব পঁচা।
-কেন বলত?
-নাহ বল না?
-হ্যা তা একটু।(মুচকি হাসি দিলাম)
-ওহ।(চুপ করে গেল)
সারাপথ চুপচাপই বসে ছিল।আর কোন কথা বলে নি।যাক
তাহলে কিছুদিন অন্তত শান্তিতে থাকা যাবে।ভেবেই শান্তি।
.
কয়েকদিন পর....
মায়াদের বাসায় দাওয়াত ছিল।আঙ্কেল আর আন্টির বিবাহ
বার্ষিকীতে।ওহ বলা হয়নি সেদিন মায়াবতী মনে ভীষন
কষ্ট পেয়েছিল যার কারনে আমার মুখদর্শন করেনি কিছুদিন।
কিন্তু আজ বোধহয় তা সুদে আসলে উসুল করে
নিয়েছে।
নীল রঙের একটা শাড়ি পরেছে,কাজল লাগিয়েছে
চোখে,বেলি ফুল দিয়েছে খোপায়, আর হাতে রঙিন
চুড়ি।আমি তো চিনতেই পারছিলাম না প্রথমে হা করে
বসেছিলাম।পাকা বোনটি ঠাট্টা করে বলল যখন ভাইয়া
ভাবীতে বিভোর তখনই বোধহয় মায়াবতীকে চিনিতে
পারিলাম।শুধু যে দেখতে সুন্দর হলে মন সুন্দর হয়না সেটা
বুঝলাম একটু পরে।আগেই বলেছিলাম মায়ামুখ দেখে মায়া
জন্মালে পরক্ষনে তাহা ছুটে যায়।
কেউ কখনো মরিচের পায়েস খেয়েছে কিনা
জানিনা,লবনের তরকারি,হলুদের মাংস।জানিনা কিভাবে খেয়ে
উঠেছিলাম অল্প করে।আবার ঠোঁট বাঁকিয়ে জিজ্ঞাসা করে
রান্নাটা কেমন হয়েছে।আমার উত্তর দেওয়ার আগে
থেকেই আব্বু প্রশংসায় ভরিয়ে তুলল।করবেই না কেন
সমস্যাটা তো আমার খাবারে। অন্যদেরটা ঠিকঠাক।বাসায় আসার
সময় চাপা শয়তানি হাসি দিল।মনে মনে ইচ্ছে করছিল ওর
সারামুখে লবন মাখিয়ে দেই।ইচ্ছেটা অপূর্নই রয়ে গেল।
.
কিছুদিন পর....
-এই শুভ্র কই তুই...
-উহু একটু পরে...
-একটু পরের গুল্লি মারি এখন উঠবি তুই।
-যা বৃষ্টির সাথে গল্প কর বিরক্ত করিস না।
-শুভ্র তোকে না উঠতে বলেছি উঠ...
-পরে বললাম তো।
এক গ্লাস পানি ঢেলে দিল চোখে মুখে।উঠে বসে
ঠিকমত চোখ খুলতে পারলাম না কলার চেপে ধরল...
-তুই কি করেছিস সত্যি করে বল?
-কি করেছি মানে আমি কি করব?
-সত্যি করে বল?
-ধুর আমি করব?
-তুই আমার বান্ধবী দোলাকে প্রেম প্রস্তাব দিস নাই?
-ওহ দোলা তোর বান্ধবী।
-বান্ধবী হোক আর বন্ধু দিয়েছিস কিনা বল?
-তুই খুশি হোস নাই?
-তাহলে এটা সত্যি..?
-তুই পারলি আমাকে ছেড়ে...
-তোকে ছেড়ে মানে? ধুর পাগলী তুই আমার একটা বন্ধু
অনেক ভাল বন্ধু।
-শুধুই বন্ধু?
-হ্যা তো।
..
দুইদিন পর....
বাসর রাত।আশ্চর্য হওয়ার কিছুই নেই। জামাই বউ দুটোই
আছে। তবে দুইজন দুই প্রান্তে ঘরের।সেদিন যখন আমার
কাছ থেকে জানল ওর বান্ধবীকে প্রেমের প্রস্তাব
দিয়েছি সারাদিন কান্না করেছে।জানিনা সেটা সত্যি কিনা।তবে
সে কান্না বিফলে যায় নি।আব্বু আম্মু দয়াল ব্যাক্তি ছেলের
এই কুকর্মের জন্য ক্ষমা চেয়ে শীঘ্রই মুটকিটাকে
আমার গলায় ঝুলিয়ে দিয়েছে।ওই তো দাড়িয়ে আকাশ
দেখছে।চোখে মুখে যুদ্ধ জয়ের চাপা শয়তানি হাসি।
এতদিন ধরে যেটাই চাইছিল সেটাই পেয়েছে।
-তুই তাহলে এখানে শুয়ে পড় আমি পাশের রুমে যাচ্ছি।
(আমি)
-তুই করে না বলে তুমি করে বলবে এখন।আর পাশের
রুমে যাচ্ছ মানে কি?
-কোন ছেলে হয়ত চায় না তার জীবন সঙ্গীনি মুটকি
হোক।
-আমাকে মাফ করে দিও তোমাকে ভালবাসে পাওয়ার
লোভটা বেশি ছিল।
-কিন্তু আমি তো ভালবাসিনি।আমারও তো সুন্দর করে নিজের
জীবনটাকে গুছিয়ে নিতে ইচ্ছে করে।
-একবার ভালবেসে দেখ আমাকে ঠকবে না কথা দিলাম।
-আমি পারবনা মায়া।তোকে কখনও ওই চোখে দেখিনি।
-আমিও তো পারব না তোমাকে ছাড়া থাকতে।
-প্লিজ মায়া আবেগের বশে যেটা করেছিস সময় আছে
এখনও ভুলটা শুধরে নে।
-আমি কোন ভুল করিনি।
-আমার জীবনটা ধংস করে তোর জীবনের শুরু হবে তুই
কি চাস আমার ক্ষতি হোক।
-নাহ কখনই না।
-তাহলে প্লিজ আগের মত সব ঠিক করে দে।
-সে তো সম্ভব নয় শুভ্র।
-তোর পায়ে পড়ি মায়া প্লিজ।
-শুভ্র কি হচ্ছে এটা এরকম করছ কেন?
-আমার ভীষন অসস্থি লাগছে মায়া।
-আমার কিছু করার নেই।
-আছে মায়া তুই সবাইকে বুঝিয়ে বললে ঠিক হয়ে যাবে।
-প্লিজ শুভ্র আমাকে এতবড় শাস্তি দিওনা।
-আমি এর থেকেও বেশি কষ্টে আছি।
-আমি পারবনা তোমাকে ছাড়া।
-পারতে হবে তোকে।তোর জন্য আমি ভাল একটা
ছেলে দেখে দিব।
-শুভ্র....(ঠাশ)
-মাথা নিচু করে আছি।
-এতটাই যখন অসহ্য তোমার কাছে আমি থাক তবে।মুক্তি
দিলাম তোমাকে।ভাল থেক শুভ্র প্রিয় বন্ধু।সবথেকে
কষ্ট কি জান তোমাকে কখনও বোঝাতেই পারলাম না কতটা
ভালবেসেছিলাম তোমাকে।আসি...
-শোন...
-হ্যা বল।
-তুমি এখানে শুয়ে পড় আজকের মত কাল সকাল হলে
চলে যেও।
-উহু আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে এই ঘরে।
-তাহলে বৃষ্টির সাথে গিয়ে ঘুমিয়ে পড় প্লিজ।
-কিছুক্ষন আমার চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে চলে
গেল।
আমি জানি ওর চোখে এক বিরহের আগুন।যে পুড়ছে শত
বছরের জ্বালা নিয়ে।আমাকে ভালবাসটা এখন ওর কাছে
বিষাক্তময়।...
.
কিছুক্ষন পর...
মোবাইলের মেসেজ অপশনে গিয়ে একটা নাম্বারে
মেসেজ সেন্ড করলাম...
-এই যে রাগকুমারী...
আধাঘন্টা পর রিপ্লে...
-হু
-একটা স্বপ্ন দেখেছিলাম পূর্ন করতে তোমাকে চাই।
-হু।
-যাবে আমার সাথে।
-অন্য কাউকে খোঁজ যে বেশি সুন্দর।
-আমি তো সুন্দরের পূজারী নই।শুধু তোমাকেই চাইছি...
-সেটা আর হয় না...
-বেঁলি ফুলগুলো শুঁকিয়ে যাচ্ছে কবে আসছ তুমি...
-আর কোনদিনই ফিরবনা।
-খাঁচাটা কি তবে শূন্য রবে....
-কত পাখি আছে যে কোন একটা বন্দী কর।
-আমার যে শুধু মায়া পাখি চাই।যে ফ্যাল ফ্যাল করে আমাকে
দেখে।
-তার চোখ হারিয়ে গেছে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে
থাকতে পারেনা।
-মেঘের দেশে একটা বাড়ি বানিয়েছিলাম রাগকুমারী কি
থাকবে সেখানে...?
-অন্য কাউকে খোঁজ।
-পৃথিবীর সব নিয়মের বাইরে গিয়ে তাকে আমার বুকে
জায়গা দিতে চাই।
-কোন যোগ্যতা নেই আমার।
-আমি যে কাঙাল সে কি জানে...
-ধন রত্নে ভরা কাউকে খুঁজে নিও।
-আচ্ছা রাগকুমারী....
-নেই...
-কোথায় গেছে....
-জানিনা...
-আমি জানি...
-ভাল।
-তাকে ছাড়া এই অপেক্ষার অবসান হবে না।
-কাউকে অপেক্ষায় থাকতে বলিনি।
-জীবনের প্রথম মাফটা আজ করলে হয় না।
-যে বুঝেও বুঝতে চায়নি তার ভুলটা ভুল নয় অন্যায়।
-আমি অপেক্ষা করছি...
-তো...?
-জানি তুমি আসবে...
-কখনই না...
-হ্যা আসতে হবে...
-নিথর দেহটা পাবে।
-এভাবে বলতে নেই...
-জানা আছে...
-তাহলে বল কেন??
-জানিনা।
-কেঁদেছ নাকি আজ খুব শুনলাম তোমার বিয়ে ছিল আজ।
-নাহ হাসছি হে হে হে।
-কেমন লাগছে আজকের অনুভুতিটা।
-ভোলার মত নয়।
-তোমার অপেক্ষায় কেউ বসে আছে...
-প্রয়োজন বোধ করি জানার...
-এভাবেই কি সুখি থাকবে...?
-জানিনা...
-কি জান?
-কিছুই না।
-যে বালিশে মাথা রেখেছ উচু করে দেখতো...!
-কেন ভূত আছে নাকি?
-থাকতেও পারে....
লাষ্ট মেসেজটা সেন্ট করে ফোনটা সুইচড অফ করলাম।
আমি জানি ও এখন কি করবে...।পাগলী মেয়ে শুধু নিজেরটা
বুঝল আমাকে বুঝল না কখনও।আড়চোখে ওকে দেখতাম
ওর পাগলামীগুলো সহ্য করতাম সেই কবে থেকে ওর
প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছি।রাগানোর জন্য মিথ্যে নাটক করছি।এত
যখন ভালবাসে একটু কি বুঝতে পারেনা।
.
ও বৃষ্টির ঘরে গিয়ে শুয়ে আছে।বালিশের নিচে একটা কিছু
রেখেছি।বড্ড বেশি ভালবাসি ওকে।হয়ত কখনও মুখ ফুটে
বলা হয়নি তবুও কি কম হয়ে যাবে ভালবাসা...।সেদিনের সেই
নূপুরটাই রেখেছি।পরেরদিন গিয়ে কিনে এনেছিলাম।
আমি যদি ঠিক শুনে থাকি তবে রিনঝিন শব্দে কেউ দ্রুত
ছুটে আসছে আমার রুমের দিকে।এইতো আমি সেই
ঝাঁঝালো চেনা পারফিউমের গন্ধ পাচ্ছি যেটা পেয়েছিল
ক্লাস ফোরে থাকতে প্রথম দেখায়।
.
কাঁদতে কাঁদতে এসে জড়িয়ে ধরেছে।পাগলী
মেয়েটা তুই মুটকী তো কি হয়েছে ভালবাসি তো
তোকে। ভীষন রকম ভালবাসি।
-ধুর পাগলী কাঁদছ কেন?
-তুমি কাঁদছ কেন?
-ভালবেসেছি তাই...
-আমিও বেসেছি তাই...
আবার বুকে ঝাপিয়ে পড়ল।এক পরম মমতায় বুকের মাঝে
চেপে ধরেছি।এ বন্ধন ছিন্ন হবার নয়...
বিড় বিড় করে গেয়ে উঠেছি....
আমারও পরান ও যাহা চায়....
তুমি তাই,তাই গো....
আমারও পরান ও যাহা চায়....
তোমা ছাড়া আর এ জগৎে....
মোর কেহ নাই,কিছু নাই
-কিসের টাকা?
-কিসের টাকা বুঝস না..?
-না।আমার ক্লাসে লেট হচ্ছে আমি গেলাম।
-ওই লম্বু ওই যাবি মানে রিকশার ভাড়া দিবে কে তোর বাপ।
-দেখ মুটকি বাপ তুলবি না কিন্তু....
-হাজার বার তুলব কি করবি তুই?
-তোর নাক ফাটিয়ে দেব।
-বাহ চমৎকার।তো ভেজা ভেড়াল থেকে কবে বাঘ হলি
রে চান্দু।
-দেখ মায়া ভার্সিটি ক্যাম্পাসে এসে ঝগড়া করিস না পাব্লিকে
দেখছে।
-তোর পাব্লিকরে টুট মারি ভাড়া দিবি কিনা বল।
-দেখ মায়া আমি কিন্তু তোর সিনিয়র বড় ভাই সম্মান দিয়ে কথা
বলিস।
-তাই না সিনিয়র দেখাচ্ছি তোকে...(একটা চোরা হাসি দিল)
-অতঃপর তাহাই ঘটিল যাহা বহুকাল হইতে চলিয়া আসিতেছে।মুটকি
ওর হাতির মত পা দিয়ে আমার পায়ের উপর কিক মারিল।ব্যাথায়
কেকিয়ে উঠতে গিয়েও চাপা আর্তনাদে শান্ত হয়ে
গেলাম।
-পকেট থেকে টাকা বের করে দিলাম।
-মুটকি সারামুখে যুদ্ধজয়ের হাসি মাখিয়ে চোখ টিপ্পুনি মারল।
-হাসবি না শয়তানি গা জ্বলে আমার।
-হাসব বেশি করে হা হা হা হো হো হো।
-কি হচ্ছে কি মায়া সবাই দেখছে। আমার মান ইজ্জত কিছু রাখলি
না।
-দরকার নাই তোর মান ইজ্জতের তোর পাশে আমি আছি
এটাই তোর গর্ব।
-ভুল বললি ওটা গর্ব না আমার দুর্ভাগ্য এবং সেটা ভয়ানক।
-কি কি বললি তুই?(চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে)
-ক্লাসে লেট হচ্ছে আমি যাই।
-যাবি মানে এই শোন..
-হুম বল।
-বলছি শোন না।(আমার শার্টের বোতাম ধরে টানাটানি
করছে)
-উফফ বলবি তো না কি।
-এত রেগে যাচ্ছিস কেন একটু রোমান্টিক হতে পারিস না।
-দেখ মায়া আমার ক্লাস অলরেডি শুরু হয়ে গেছে এখন না
গেলে মিস করে যাব।
-একটা ক্লাস মিস করলে কিছু হবেনা।
-তুই বলবি না আমি যাব।
-এই বলছি তো শোন না..
-হুম বল।
-আমার চোখের দিকে তাকা একটু।
-আমার কিন্তু রাগ হচ্ছে এবার মায়া।
-আচ্ছা যা আর বলব না।
-ওকে গেলাম।
-এই শোন না...
-আবার কি...?
-বলছি বললি না তো আমার কানের দুলটা কেমন হয়েছে..?
-তোর কানে আবার দুল হা হা হা কই দেখছি না তো।
-এইতো এই যে দেখ।
-হা হা হা হা
-হাসলি কেন ভাল হয় নি...?
-এত ছোট দুল তোর হাতির মত কানে হে হে হে....
-শয়তান আমার হাতির মত কান? দেখিস তোর বউয়ের
গন্ডারের মত কান হবে না না তোর বউয়ের পেত্নির মত
এত্ত বড় কান হবে।
-আচ্ছা হবে।এখন যাই।
-এই শোন না?
-আবার কি হল...?
-ক্লাস শেষে চল না একটু ঘুরে আসি..
-পাগল নাকি আমার কাজ আছে।
-তোর আবার কিসের কাজ আন্টি তো বলে তুই নাকি সারাদিন
শুয়ে থাকিস।
-হ্যা আমি সারাদিন শুয়ে থাকি আর ভার্সিটিতে তোর বাপ
আসে।
-ঐ ফইন্নি মুখ সামলে কথা বলবি উনি তোর মুরব্বী।
-ও তাই তাহলে যখন আমার আব্বুকে তুলিস তখন মনে
থাকেনা।
-আমার তো মাথা গরম হয়ে যায়।
-আমারও হয়।
-না হবে না।
-হবে।
-হবে না।
-এই যা ক্লাসের আধাঘন্টা পার হয়ে গেছে তোর জন্য
শুধু মুটকি।
-হু একদম গায়ে দোষ দিবিনা।নিজেই তো আমার সাথে
বকবক করছিস।
-তুই একটা...
-আমি একটা কি?
-আজব পেইন।
-কি বললি আবার বল...
-কিছুনা।
-না বল...
-কিছু না তো।
-আমি পেইন না...
-আ হু উ হু হু হু হু
-হি হি হি আশেপাশে কেউ নেই রে তোর কপাল ভাল
কোন মেয়ে নেই।
-আমি কিন্তু প্রতিশোধ নিব মায়া।
-যা যা।
-হু।(ঘাড় ঘুরিয়ে হাঁটা দিলাম)
-ঠিক একঘন্টা পর যেন তোকে এখানে পাই।(চেচিয়ে
বলল)
-পারবনা আসতে।
-তোর বাপ আসবে চৌদ্দ গুষ্ঠী আসবে।
-ইচ্ছে করছে দৌড়ে গিয়ে মুটকির নাকটা ফাটিয়ে দেই।
কিন্তু অদৃশ্য এক বেড়াজালে আমি বিদ্ধ।
.
পৃথিবীর বুকে জীবন্ত ডাইনী যদি কেউ দেখতে চায়
এই মুটকী মায়াকে দেখতে পারে সে।লম্বা নখ
ভ্যাম্পায়ের মত দাঁত আর স্বভাবটা জল্লাদদের থেকেও
বেশি খারাপ।তবে চেহারাটা মিষ্টি চেয়ে বেশি কিছু।যদি
কেউ ত্রিশ সেকেন্ড তার চোখের দিকে তাকিয়ে
থাকে নিশ্চিত সে প্রেমে হাবুডুবু খাবে।এই ডাইনীটা
রাক্ষসীর মত একটু মুটকি।আমি বেশ টের পাই ওকে যখন
প্রথম প্রথম মুটকী বলে ক্ষেপিয়ে তুলতাম রাগে
নিজের মাথার চুল ছিড়ত কেঁদে ফেলত।সেখান থেকেই
চেষ্টা করে যাচ্ছে না খেয়ে বিভিন্ন উপায়ে স্বাভাবিক
হওয়ার জন্য।যদিও আমি জানি ওকে মুটকি বললে এখন আর
সামনা সামনি রাগ করেনা কিন্তু লুকিয়ে কাঁদে।
.
যাই হোক ওই ডাইনীর চোখের জল দেখে যে
আবেগে গলে যাবে সে করবে মস্ত ভুল।যেমনটা
আমি করেছি।ওকে বেশি কথা বললেই চোখের পানি
নাকের মিশে একাকার।কিছুই বলতে পারিনা কারন ওকে কাঁদতে
দেখলে আমার এতটা খারাপ লাগে কেন জানিনা।এই দুর্বলতার
সুযোটাই ও ব্যাবহার করে।আমার ঘাড়ে ওঠার সেই করুন
কাহিনী একটু বর্ণনা করি...
খুব বেশি একটা ছোট ছিলাম না তখন।ক্লাস ফোরে পড়তাম।
ভাল মন্দ বোঝার বয়স হয়েছে একটু একটু।একদিন আব্বু
এসে বলল আমরা কাল শাহরিয়ার আঙ্কেলের বাসায় যাব
বেড়াতে।শাহরিয়ার আঙ্কেল আব্বুর ব্যাবসার নতুন পার্টনার
শুনেছিলাম আম্মুর কাছে তবে কোনদিন যাইনি কারন
আঙ্কেলরা একটু দূরে থাকত তবে এখন নাকি আমাদের
পাশের বাসায় এসে উঠেছে।তো যাই হোক এটা নিয়ে
আমার কোন মাথাব্যাথা ছিলনা যদিও কিন্তু আম্মু আমাকে বলল
সেখানে নাকি আমার এক নতুন বন্ধু হবে।সারাদিন ঘরে
বন্দী থাকা এক কিশোরের কানে যদি কেউ বলে তার
একটা বন্ধু হবে তাহলে তার মনে যে কতটা খুশি জমে
বলতে পারব না।প্রচন্ড খুশি মনে গেলাম আঙ্কেলের
বাসায়।আন্টি আমার গাল টিপে দিয়েছিল এখনও মনে আছে।
তো সারা বাসায় দেখি মাইকেল জ্যাকসনের পোশাক পরিহিতা
একজন দৌড়ে বেড়াচ্ছে।বুঝতেই পারছিনা ছেলে না
মেয়ে।চুলগুলো যদিও একটু লম্বা তবে হাব ভাব দেখে
মনে হচ্ছে ছেলে।যাই হোক সেদিকে আমার কোন
খেয়াল নেই আমি খুঁজছিলাম আমার মত আমার বন্ধুটিকে।কারন
আমার বন্ধু তো আমার সমবয়সী হবে।যেটা সারাঘরে
দৌড়ে বেড়াচ্ছে সে আমার থেকে অনেক ছোট
পিচ্চি।ঘুরতে ঘুরতে একটা রুমে এসে আমি একটা নীল ঘুড়ি
দেখে হাতে তুলে নেই।সত্যি বলতে ওটা আমার ভীষন
পছন্দ হয়েছিল।মনে মনে ভেবেছিলাম আমার অচেনা
বন্ধুটির হয়ত।
কিন্তু আমার সব ভাবনায় ছেদ পড়ল।হাতে প্রচন্ড ব্যাথা অনুভব
করলাম।মনে হচ্ছিল কেউ সুচ ঢুকিয়ে দিয়েছে।হাতের
দিকে তাকাতেই দেখি মাইকেল জ্যাকসনের কপি টা আমার
হাত কামড়ে ধরে আছে।একটানে ছাড়িয়ে ব্যাথায় ককিয়ে
উঠে বললাম কে তুমি..?
-আমি কে তা জেনে তোর লাভ কি...?
-এই তুমি তুই তুই করে বলছ কেন?
-হে হে হে হে কেন তুই কি আমার থেকে অনেক
বড় যে তোকে তুমি করে বলতে হবে।
-হ্যা বড় তুমি করে বল।
-বলব না কি করবি?
-আম্মুকে বলে দেব।
-হে হে হে ভীতুর ।
-মোটেও না।
-তাহলে চোর...
-এই আমাকে চোর বলবে না।
-একশতবার বলব তুই চোর চোর চোর চোর
-চুপ আমি কি চুরি করেছি?
-আমার ঘুড়ি চুরি করেছিস।
-মোটেও না আমি শুধু দেখছিলাম।
-ও তাই....
আস্তে আস্তে আমার কাছে এসে মাথায় মাথা ঠেকিয়ে
কিছুক্ষন বাঘিনীর মত তাকিয়ে থেকে বলল...
-বন্ধু হবি না শত্রু...
-মা মা মা মানে...?(আমতা আমতা করে বললাম)
-কোনটা হবি?
-তুমি অনেক ছোট তুমি আমার বন্ধু হতে পারবেনা।
-ও তাই তাহলে আমার শত্রু হবি হা হা হা।
-মোটেও না আমরা কিছু হবনা।
-কিছু তো একটা হতে হবে। তাছাড়া তোর গালটা অনেক
সুন্দর তোকে আমার ভাল লেগেছে আয় আমরা বন্ধু হই।
-কখনই না।
-কি বললি?
-হবনা।
-তোর বাপ হবে।(বলেই হাতে কামড় বসাল)
কি জানি কি হল আমার ব্যাথায় চিৎকার করতেও ভুলে গেলাম।ওর
চোখের দিকে তাকিয়ে অজান্তেই কখন হ্যা বলে
ফেলেছিলাম।আর এই রাজি হওয়াটাই আমার জীবনের
অভিশাপের মত নেমেছে।
সময়ের সাথে সাথে বেড়ে উঠেছি যদিও এখন এই
অবস্থানে এসেও ওকে বোঝাতে পারলাম না আমরা বন্ধু
হতে পারিনা।আমি থার্ড ইয়ারে আর সে ফার্ষ্ট ইয়ারে।বাসা
হোক,ক্যাম্পাস হোক,কিংবা বাইরে কোথাও তুই করে সে
বলবেই।এত করে বলি মায়া বড় হয়েছিস একটু বোঝ তবু
মুটকি পাত্তাই দেয়না।আমাকে সেই যে জ্বালিয়ে আসছে
এখনও জ্বালায়।নিজের মনের মত করে জ্বালাবে বলে
পাব্লিক ভার্সিটি ছেড়ে প্রাইভেট ভার্সিটিতে এসেছে
যেটায় আমি পড়ি।সময়ের সাথে সব বদলালেও ওর মাস্তানী
স্বভাব যায়নি।এখন অবশ্য মানুষের সামনে হাতে কামড় দিতে
পারেনা তাই অস্ত্র হিসেবে ওর পা দিয়ে আমার পায়ের
উপর এত্ত জোরে আঘাত হানবে নাইবা বললাম সে যন্ত্রনার
কথা।না পারি ব্যাথায় শব্দ করতে না পারি পাল্টা জবাব দিতে।বেশি
কিছু আবার বলতে গেলে আমারই বেশি ক্ষতি।কয়েকদিন
আগে ওর সাথে সিনেমা দেখতে যাইনি।মায়ের কাছে
নালিশ গেছে আমি নাকি কোনদিনও ক্লাস করিনা সারাদিন সিনেমা
হলে পড়ে থাকি।মা ও তেমন গপ গপ করে গিলে
ফেলে সাজানো গোছানো মিথ্যে গুলো।আর
গিলবেই বা না কেন আমার মিষ্টির ডিব্বা বোন আছে না।মায়ার
সাথে গলায় গলায় ভাব।নাইবা বললাম দুঃখের কথা।কিছু কিছু
মানুষের জীবন এমনই সীমাবাধা নিয়মে চলে।
এতকিছু সহ্য করার পরেও যখন স্বাভাবিক ভাবেই নিচেকে
গুছিয়ে তুলেছি।তখনই শুরু হয়েছে নতুন মাত্রার প্যারা।আমি
জানি মায়া একটু একটু করে স্বপ্ন বুনতে শুরু করেছে।
সেদিন বাসায় মাকেও বলতে শুনেছি মায়াকে পুত্রবধু
করবে।আমি এসব নিয়ে ভাবতেই পারিনা।একটা প্রেম পর্যন্ত
করতে পারিনি।একবার তো একটা মেয়েকে রাজি করিয়েই
ফেলেছিলাম।কিন্তু কোথা থেকে মুটকি এসে বলে
সে নাকি আমার বিয়ে করা বউ।তারপর আর কি?যা হবার তাই হল।
সুন্দরী ললনার পাঁচ আঙুলের দাগ বসল গালে।একে তো
প্রেমে ব্যার্থ হয়ে দুঃখে আছি তার উপর মুটকি টা কানের
কাছে লাউড মিউজিক বাজাচ্ছে।দিলাম একটা থাপ্পড়। কেমন
লাগে বুঝে দেখ।হা হা হা সেবার রাগ করে একমাস কথা
বলেনি আমার সাথে।কিন্তু আশ্চর্য্য হয়েছিলাম ও বাসায় কিছু
বলেনি।যাই হোক এভাবেই সে প্যারায় ডুবিয়ে রাখে
আমাকে।এতকিছুর পর ওর নিষ্পাপ মুখটা আমাকে পথভ্রষ্ট
করে...।
.
একঘন্টা পনের মিনিট পর....
হাঁপাতে হাঁপাতে আসলাম গেইটের বাইরে....।
-বুনো ষাঁড়ের মত কোথা থেকে ছুটে আসলি।
-ক্যান্টিন থেকে।
-কয়টা বাজে এখন।
-কত বাজে জানিনা তবে পনের মিনিট লেইট হয়েছে।
-বাহ সময় জ্ঞান আছে দেখি।
-চল।
-যাব তো এদিকে আয়।
-না রে ভাই পায়ে ভীষন ব্যাথা।
-তো দাঁত কেলিয়ে যখন বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে
দিতে ভুলে যাস কেউ একজন ওয়েট করছে তোর
জন্য তখন মনে থাকেনা?
-স্যরি তো।
-তোর স্যরির গুল্লি মারি।
-আচ্ছা তোকে তিনটে আইসক্রিম দিব।
-ও হ্যালো আমি বাচ্চা না যে এসব কথায় গলে যাব।
-তো পাকা বুড়ি বলেন আপনার লাগবে।
-উমমমম ভাবতে দে।
-ভাব ফইন্নি।
-কিছু বললি?
-কই না তো।
-আমাকে নিয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত লেকের পাশে বসতে
হবে।
-ইম্পসিবল।
-ও তাই না আয় এদিকে।।
-এই না এটা কিন্তু অন্যায়....
-তাহলে বল যাবি?
-নাহ...
-দাড়া ওখানে...
-এই না না মায়া....
ছো মেরে রিকশায় তুলল আমাকে।তাকিয়ে আছি ওর
দিকে।চাপা শয়তানি হাসি হাঁসছে মনে মনে....
.
সন্ধ্যার ক্ষনিক আগে....
-এই নে বাদাম এবার উঠ ফিরতে রাত হয়ে যাবে।
-হোক সমস্যা নাই।
-তোর নাই কিন্তু আমার আছে।
-তোর লজ্জা করেনা আমি মেয়ে হয়ে বলছি আমার
সমস্যা নেই আর তুই ছেলে হয়ে সমস্যার কথা বলছিস।
-বাসায় গেলে আজকে আম্মু কি করবে তুই জানিস না।
-আমি বলে দেব আন্টিকে। এখন বাদাম খা তো।
-তুই খা মুটকি।আর শোন...
-কি?
-পরের বার থেকে না তোর বি এফ কে নিয়ে আসিস।
-হা হা হা হা
-হাসলি যে...
-কিছুনা এমনি।
-চল উঠি।
-উমমমম হাতটা ধর আমার...
-পারবনা।
-কি বললি?
-ধরছি।
-হুম।
-এভাবে জাপটে ধরলে হাঁটব কি করে।(আমার হাতের
ভিতরে একহাত দিয়ে মাথাটা কাঁধে রেখে হাঁটছে)
-জানিনা আমার শীত করছে।
-সে তো করবে।বার বার বলেছিলাম আসতে হবেনা।
-উফফ তুই থামবি। চুপ করে হাঁট তো।
.
বাসায় পৌছে দিয়ে আমার বাসায় আসলাম।আশ্চর্য কেউ
কোন কৈফিয়ত চাইলনা।শুধু মা একবার জিজ্ঞাসা করল দুপুরে কিছু
খেয়েছি কিনা।অবশ্য আমি জানি মায়ার সাথে সারা দিন রাত
থাকলে কেউ কিছু বলবেনা।এতে তো উনাদেরই লাভ।
খেয়ে দেয়ে নিজের রুমে এসে শুয়ে পড়েছি।
-উহুম উহুম(মিষ্টি বোনের প্রবেশ)
-কি যেন শুনছি রে ভাইয়া।
-কি শুনছ তুমি..?
-নাহ তেমন কিছু না আবার অনেক কিছু...।
-তো কি সেটা বলে ফেল আর কার থেকে শুনছ নাম
বল।
-কতকিছুই তো শুনছি। আকাশে বাতাসে ভেসে আসছে
আমার কানে।
-সোজাসুজি বলবি তুই?
-না মানে আজকে সারাদিন কোথায় ছিলি রে তুই?
-তোর জন্য জামাই দেখতে গেছিলাম।
-ওহ ভাল। তো জামাই কি আজকাল লেকের পাশে ভাবীর
পাশে বসে দেখতে হয় ভাইয়া।
-ফালতু কথা কে বলে তোকে?
-সব কি আর বলা লাগে আমাদের ও তো চোখ আছে
নাকি।
-চোখ দিয়ে ভাল কিছু দেখা যায় না।
-ভাইয়া ভাবী প্রেম করছে এর থেকে ভাল দৃশ্য আর কি
হতে পারে।
-তুই যাবি না আমি আম্মুকে ডাকব।
-বিয়েটা তাড়াতাড়ি সেরে ফেল রে।
-আম্মু তোমার মেয়েকে ডাক দাও তো।
আমি বুঝিনা এই শাঁকচুন্নীর কানে খবরটা কে দেয়।নিশ্চয়ই
ওই মুটকি দিয়েছে।
.
পরেরদিন.....
ক্যাম্পাস থেকে একপ্রকার কিডন্যাপ করেই ধরে
এনেছে আমাকে।দীর্ঘ তিন ঘন্টা যাবৎ শপিং মলে ঘুরছি।
একটা নূপুরের জন্য এত সময় কেউ ব্যায় করে।
-এই শুভ্র এই...
-হুম বল।
-দেখ না এইটা কেমন আমাকে মানাবে তো?(নীল পাথর
বসানো সুন্দর একজোড়া নূপুর দেখিয়ে বলল)
-ওইটা তোর পায়ে দিলে হাতির পায়ে শিকল দেওয়ার মত
লাগবে।
-ধুর আর কিনবই না।
-কেন?
-তুই সবসময় এমন করিস।
-যাহ আমি তো সত্যিটাই বলেছি।
-চোখ কটমট করে কিছুক্ষন তাকাল তারপর বেরিয়ে আসল।
রিক্সায় উঠে বসেছি....
-আমি কি দেখতে সত্যিই খুব পঁচা।
-কেন বলত?
-নাহ বল না?
-হ্যা তা একটু।(মুচকি হাসি দিলাম)
-ওহ।(চুপ করে গেল)
সারাপথ চুপচাপই বসে ছিল।আর কোন কথা বলে নি।যাক
তাহলে কিছুদিন অন্তত শান্তিতে থাকা যাবে।ভেবেই শান্তি।
.
কয়েকদিন পর....
মায়াদের বাসায় দাওয়াত ছিল।আঙ্কেল আর আন্টির বিবাহ
বার্ষিকীতে।ওহ বলা হয়নি সেদিন মায়াবতী মনে ভীষন
কষ্ট পেয়েছিল যার কারনে আমার মুখদর্শন করেনি কিছুদিন।
কিন্তু আজ বোধহয় তা সুদে আসলে উসুল করে
নিয়েছে।
নীল রঙের একটা শাড়ি পরেছে,কাজল লাগিয়েছে
চোখে,বেলি ফুল দিয়েছে খোপায়, আর হাতে রঙিন
চুড়ি।আমি তো চিনতেই পারছিলাম না প্রথমে হা করে
বসেছিলাম।পাকা বোনটি ঠাট্টা করে বলল যখন ভাইয়া
ভাবীতে বিভোর তখনই বোধহয় মায়াবতীকে চিনিতে
পারিলাম।শুধু যে দেখতে সুন্দর হলে মন সুন্দর হয়না সেটা
বুঝলাম একটু পরে।আগেই বলেছিলাম মায়ামুখ দেখে মায়া
জন্মালে পরক্ষনে তাহা ছুটে যায়।
কেউ কখনো মরিচের পায়েস খেয়েছে কিনা
জানিনা,লবনের তরকারি,হলুদের মাংস।জানিনা কিভাবে খেয়ে
উঠেছিলাম অল্প করে।আবার ঠোঁট বাঁকিয়ে জিজ্ঞাসা করে
রান্নাটা কেমন হয়েছে।আমার উত্তর দেওয়ার আগে
থেকেই আব্বু প্রশংসায় ভরিয়ে তুলল।করবেই না কেন
সমস্যাটা তো আমার খাবারে। অন্যদেরটা ঠিকঠাক।বাসায় আসার
সময় চাপা শয়তানি হাসি দিল।মনে মনে ইচ্ছে করছিল ওর
সারামুখে লবন মাখিয়ে দেই।ইচ্ছেটা অপূর্নই রয়ে গেল।
.
কিছুদিন পর....
-এই শুভ্র কই তুই...
-উহু একটু পরে...
-একটু পরের গুল্লি মারি এখন উঠবি তুই।
-যা বৃষ্টির সাথে গল্প কর বিরক্ত করিস না।
-শুভ্র তোকে না উঠতে বলেছি উঠ...
-পরে বললাম তো।
এক গ্লাস পানি ঢেলে দিল চোখে মুখে।উঠে বসে
ঠিকমত চোখ খুলতে পারলাম না কলার চেপে ধরল...
-তুই কি করেছিস সত্যি করে বল?
-কি করেছি মানে আমি কি করব?
-সত্যি করে বল?
-ধুর আমি করব?
-তুই আমার বান্ধবী দোলাকে প্রেম প্রস্তাব দিস নাই?
-ওহ দোলা তোর বান্ধবী।
-বান্ধবী হোক আর বন্ধু দিয়েছিস কিনা বল?
-তুই খুশি হোস নাই?
-তাহলে এটা সত্যি..?
-তুই পারলি আমাকে ছেড়ে...
-তোকে ছেড়ে মানে? ধুর পাগলী তুই আমার একটা বন্ধু
অনেক ভাল বন্ধু।
-শুধুই বন্ধু?
-হ্যা তো।
..
দুইদিন পর....
বাসর রাত।আশ্চর্য হওয়ার কিছুই নেই। জামাই বউ দুটোই
আছে। তবে দুইজন দুই প্রান্তে ঘরের।সেদিন যখন আমার
কাছ থেকে জানল ওর বান্ধবীকে প্রেমের প্রস্তাব
দিয়েছি সারাদিন কান্না করেছে।জানিনা সেটা সত্যি কিনা।তবে
সে কান্না বিফলে যায় নি।আব্বু আম্মু দয়াল ব্যাক্তি ছেলের
এই কুকর্মের জন্য ক্ষমা চেয়ে শীঘ্রই মুটকিটাকে
আমার গলায় ঝুলিয়ে দিয়েছে।ওই তো দাড়িয়ে আকাশ
দেখছে।চোখে মুখে যুদ্ধ জয়ের চাপা শয়তানি হাসি।
এতদিন ধরে যেটাই চাইছিল সেটাই পেয়েছে।
-তুই তাহলে এখানে শুয়ে পড় আমি পাশের রুমে যাচ্ছি।
(আমি)
-তুই করে না বলে তুমি করে বলবে এখন।আর পাশের
রুমে যাচ্ছ মানে কি?
-কোন ছেলে হয়ত চায় না তার জীবন সঙ্গীনি মুটকি
হোক।
-আমাকে মাফ করে দিও তোমাকে ভালবাসে পাওয়ার
লোভটা বেশি ছিল।
-কিন্তু আমি তো ভালবাসিনি।আমারও তো সুন্দর করে নিজের
জীবনটাকে গুছিয়ে নিতে ইচ্ছে করে।
-একবার ভালবেসে দেখ আমাকে ঠকবে না কথা দিলাম।
-আমি পারবনা মায়া।তোকে কখনও ওই চোখে দেখিনি।
-আমিও তো পারব না তোমাকে ছাড়া থাকতে।
-প্লিজ মায়া আবেগের বশে যেটা করেছিস সময় আছে
এখনও ভুলটা শুধরে নে।
-আমি কোন ভুল করিনি।
-আমার জীবনটা ধংস করে তোর জীবনের শুরু হবে তুই
কি চাস আমার ক্ষতি হোক।
-নাহ কখনই না।
-তাহলে প্লিজ আগের মত সব ঠিক করে দে।
-সে তো সম্ভব নয় শুভ্র।
-তোর পায়ে পড়ি মায়া প্লিজ।
-শুভ্র কি হচ্ছে এটা এরকম করছ কেন?
-আমার ভীষন অসস্থি লাগছে মায়া।
-আমার কিছু করার নেই।
-আছে মায়া তুই সবাইকে বুঝিয়ে বললে ঠিক হয়ে যাবে।
-প্লিজ শুভ্র আমাকে এতবড় শাস্তি দিওনা।
-আমি এর থেকেও বেশি কষ্টে আছি।
-আমি পারবনা তোমাকে ছাড়া।
-পারতে হবে তোকে।তোর জন্য আমি ভাল একটা
ছেলে দেখে দিব।
-শুভ্র....(ঠাশ)
-মাথা নিচু করে আছি।
-এতটাই যখন অসহ্য তোমার কাছে আমি থাক তবে।মুক্তি
দিলাম তোমাকে।ভাল থেক শুভ্র প্রিয় বন্ধু।সবথেকে
কষ্ট কি জান তোমাকে কখনও বোঝাতেই পারলাম না কতটা
ভালবেসেছিলাম তোমাকে।আসি...
-শোন...
-হ্যা বল।
-তুমি এখানে শুয়ে পড় আজকের মত কাল সকাল হলে
চলে যেও।
-উহু আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে এই ঘরে।
-তাহলে বৃষ্টির সাথে গিয়ে ঘুমিয়ে পড় প্লিজ।
-কিছুক্ষন আমার চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে চলে
গেল।
আমি জানি ওর চোখে এক বিরহের আগুন।যে পুড়ছে শত
বছরের জ্বালা নিয়ে।আমাকে ভালবাসটা এখন ওর কাছে
বিষাক্তময়।...
.
কিছুক্ষন পর...
মোবাইলের মেসেজ অপশনে গিয়ে একটা নাম্বারে
মেসেজ সেন্ড করলাম...
-এই যে রাগকুমারী...
আধাঘন্টা পর রিপ্লে...
-হু
-একটা স্বপ্ন দেখেছিলাম পূর্ন করতে তোমাকে চাই।
-হু।
-যাবে আমার সাথে।
-অন্য কাউকে খোঁজ যে বেশি সুন্দর।
-আমি তো সুন্দরের পূজারী নই।শুধু তোমাকেই চাইছি...
-সেটা আর হয় না...
-বেঁলি ফুলগুলো শুঁকিয়ে যাচ্ছে কবে আসছ তুমি...
-আর কোনদিনই ফিরবনা।
-খাঁচাটা কি তবে শূন্য রবে....
-কত পাখি আছে যে কোন একটা বন্দী কর।
-আমার যে শুধু মায়া পাখি চাই।যে ফ্যাল ফ্যাল করে আমাকে
দেখে।
-তার চোখ হারিয়ে গেছে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে
থাকতে পারেনা।
-মেঘের দেশে একটা বাড়ি বানিয়েছিলাম রাগকুমারী কি
থাকবে সেখানে...?
-অন্য কাউকে খোঁজ।
-পৃথিবীর সব নিয়মের বাইরে গিয়ে তাকে আমার বুকে
জায়গা দিতে চাই।
-কোন যোগ্যতা নেই আমার।
-আমি যে কাঙাল সে কি জানে...
-ধন রত্নে ভরা কাউকে খুঁজে নিও।
-আচ্ছা রাগকুমারী....
-নেই...
-কোথায় গেছে....
-জানিনা...
-আমি জানি...
-ভাল।
-তাকে ছাড়া এই অপেক্ষার অবসান হবে না।
-কাউকে অপেক্ষায় থাকতে বলিনি।
-জীবনের প্রথম মাফটা আজ করলে হয় না।
-যে বুঝেও বুঝতে চায়নি তার ভুলটা ভুল নয় অন্যায়।
-আমি অপেক্ষা করছি...
-তো...?
-জানি তুমি আসবে...
-কখনই না...
-হ্যা আসতে হবে...
-নিথর দেহটা পাবে।
-এভাবে বলতে নেই...
-জানা আছে...
-তাহলে বল কেন??
-জানিনা।
-কেঁদেছ নাকি আজ খুব শুনলাম তোমার বিয়ে ছিল আজ।
-নাহ হাসছি হে হে হে।
-কেমন লাগছে আজকের অনুভুতিটা।
-ভোলার মত নয়।
-তোমার অপেক্ষায় কেউ বসে আছে...
-প্রয়োজন বোধ করি জানার...
-এভাবেই কি সুখি থাকবে...?
-জানিনা...
-কি জান?
-কিছুই না।
-যে বালিশে মাথা রেখেছ উচু করে দেখতো...!
-কেন ভূত আছে নাকি?
-থাকতেও পারে....
লাষ্ট মেসেজটা সেন্ট করে ফোনটা সুইচড অফ করলাম।
আমি জানি ও এখন কি করবে...।পাগলী মেয়ে শুধু নিজেরটা
বুঝল আমাকে বুঝল না কখনও।আড়চোখে ওকে দেখতাম
ওর পাগলামীগুলো সহ্য করতাম সেই কবে থেকে ওর
প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছি।রাগানোর জন্য মিথ্যে নাটক করছি।এত
যখন ভালবাসে একটু কি বুঝতে পারেনা।
.
ও বৃষ্টির ঘরে গিয়ে শুয়ে আছে।বালিশের নিচে একটা কিছু
রেখেছি।বড্ড বেশি ভালবাসি ওকে।হয়ত কখনও মুখ ফুটে
বলা হয়নি তবুও কি কম হয়ে যাবে ভালবাসা...।সেদিনের সেই
নূপুরটাই রেখেছি।পরেরদিন গিয়ে কিনে এনেছিলাম।
আমি যদি ঠিক শুনে থাকি তবে রিনঝিন শব্দে কেউ দ্রুত
ছুটে আসছে আমার রুমের দিকে।এইতো আমি সেই
ঝাঁঝালো চেনা পারফিউমের গন্ধ পাচ্ছি যেটা পেয়েছিল
ক্লাস ফোরে থাকতে প্রথম দেখায়।
.
কাঁদতে কাঁদতে এসে জড়িয়ে ধরেছে।পাগলী
মেয়েটা তুই মুটকী তো কি হয়েছে ভালবাসি তো
তোকে। ভীষন রকম ভালবাসি।
-ধুর পাগলী কাঁদছ কেন?
-তুমি কাঁদছ কেন?
-ভালবেসেছি তাই...
-আমিও বেসেছি তাই...
আবার বুকে ঝাপিয়ে পড়ল।এক পরম মমতায় বুকের মাঝে
চেপে ধরেছি।এ বন্ধন ছিন্ন হবার নয়...
বিড় বিড় করে গেয়ে উঠেছি....
আমারও পরান ও যাহা চায়....
তুমি তাই,তাই গো....
আমারও পরান ও যাহা চায়....
তোমা ছাড়া আর এ জগৎে....
মোর কেহ নাই,কিছু নাই
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন